কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
মানবেতর জীবনযাপন করছেন চা বাগানের শ্রমিকরা। একজনের বেশি শ্রমিক নেয় না চা বাগান, বড় অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাদের পরিবারের। পরিবার নিজেদের এই মানবেতর জীবনযাপনের জন্য শ্রমিক নেতারা দায়ী করছেন চা বাগানের মালিকদের। চা বাগানের মালিকরা নিজ প্রয়োজনে অশিক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ রেখেছেন চা-শ্রমিকদের। তাদের জীবনমান উন্নতির জন্য কোনো পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে না। যে কারণে তাদের বেকারত্ব থেকে মুক্তি মিলছে না।
সমরায় নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘কাজের সন্ধানে দা, কুড়াল ও করাত নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে কাজ খুঁজে বেড়াই। কোনো দিন ৩০০-৪০০ রুজি হয়, কোনো দিন কাজ ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয়। কাজের জন্য প্রতিদিন ২০-২৫ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় কাজের সন্ধানে যেতে হয়। কাজ না পেলে অনাহারে দিন কাটাতে হয়।’ ‘পরিবারে পাঁচ-ছয়জন সদস্য। স্ত্রী বাগানে ১৭০ টাকা মজুরিতে কাজ করে। এই টাকা দিয়ে পরিবার চলে না। কয়েকটা টাকার জন্য কাজের খোঁজে প্রতিদিন কাঁধে কুড়াল নিয়ে গ্রামগঞ্জে বেরিয়ে পড়ি। কোনো দিন কাজ মিলে, কোনো দিন খালি হাতে বাড়িতে ফিরতে হয়।’ কথাগুলো কমলগঞ্জের শমশেরনগর চা-বাগানের গবী নামের এক শ্রমিকের।
এদিকে নিজেদের এই মানবেতর জীবনযাপনের জন্য শ্রমিক নেতারা দায়ী করছেন চা বাগানের মালিকদের। তারা বলছেন, চা বাগানের মালিকেরা নিজ প্রয়োজনে অশিক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ রেখেছেন চা-শ্রমিকদের। তাদের জীবনমান উন্নতির জন্য কোনো পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে না। যে কারণে তাদের বেকারত্ব থেকে মুক্তি মিলছে না। চা শ্রমিক সুখ বলেন, চা বাগানে একজন কাজ করলে পরিবারের অন্য সদস্যরা বেকার থাকেন। একজনের বেশি বাগানের কাজে নেয়া হয় না। বেকারত্বের সমস্যা সমাধানের জন্য যুগ যুগ ধরে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। প্রতি একর জায়গা অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও বাগান মালিকরা দিচ্ছেন না। বাগানে কাজ না পেয়ে তারা বাইরে কাজ খুঁজছেন।
বাগানের শ্রমিক সমরায় বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্য ছয়জন। এরমধ্যে আমার স্ত্রী শুধু বাগানে কাজ করে। এই টাকা দিয়ে পরিবার চালানো সম্ভব না। বাগানে কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে কয়েকজনের একটি দল করে আমরা কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি।’
কমলগঞ্জের কানিহাঁটি চা বাগানের শ্রমিক গরীব ও সুখ বলেন, ‘একবেলা ডাল-ভাতের জন্য কাজের সন্ধানে বের হই প্রতিদিন। গ্রামে গ্রামে সারা দিন হেঁটে কোনো দিন কাজ মিলে, আবার কখনো খালি হাতে ফিরতে হয়। কাজ না মিললে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আমরা সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় অনেক কমে কাজ করি। একজন শ্রমিক এখন ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে, আর আমরা ৩০০-৪০০ টাকায় কাজ করি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহী উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, চা বাগানে বেকারত্ব দূর করার জন্য বাগান কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। চা বাগানে এখনো হাজার হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি আছে। এগুলো বেকার চা-শ্রমিক ও তাদের সন্তানকে চাষাবাদ করার জন্য দেয়া হলে বেকারত্ব কিছুটা দূর হবে। তাতে তাদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে কাজের জন্য ঘুরতে হবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাগানে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়েনি। বাগানের মালিক পক্ষ চাইলে অনেক শ্রমিকের বেকারত্ব দূর করতে পারে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
